[SSC] বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় ২য় অধ্যায় সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর

সৃজনশীলঃ ০১

রাজনীতিতে হাে-চি-মিন অতুলনীয় অবদান রেখেছেন। তার সংগ্রামী জীবন তাকে ভিয়েতনামের রাজনীতিতে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। স্বার্থান্ধ ব্যক্তিদের কুক্ষিগত করে রাখা মানবতাকে তিনি গণমানুষের জন্য মুক্ত করেছিলেন। তাকে ভিয়েতনামের জাতির জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। 

ক. কিংসলে ডেভিস প্রদত্ত সামাজিক পরিবর্তনের সংজ্ঞাটি লেখ।
খ. ছয় দফায় উল্লিখিত দাবিসমূহ কী কী?
গ. পাঠ্যপুস্তকের কোন চরিত্রটির সাথে উদ্দীপকের হাে-চি-মিনের বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ডের মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. “ইঙ্গিতপূর্ণ চরিত্রের দৃঢ়তা এবং আপসহীন নেতৃত্বেই আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।” -উক্তিটির সপক্ষে যুক্তি দাও । 

ক) সামাজিক পরিবর্তনের সংজ্ঞায় কিংসলে ডেভিস বলেন, “সামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে সামাজিক সংগঠনের মধ্যকার পরিবর্তন।” 

খ) ছয় দফায় উল্লিখিত দাবিসমূহ হচ্ছে- ১. পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাধীনে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হবে। সর্বজনীন ভােটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভােটে নির্বাচন অনুষ্ঠান। ২. কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মাত্র দুটি বিষয় থাকবে, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যান্য সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলাের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। ৩. সারাদেশে হয়। অবাধে বিনিয়ােগযােগ্য দু'ধরনের মুদ্রা, না হয় বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একই ধরনের মুদ্রা প্রচলিত থাকবে। ৪. সকল প্রকার কর ধার্য করার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আলিক সরকারের আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। ৫. অঙ্গরাজ্যগুলাে নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে, এর নির্ধারিত অংশ তারা কেন্দ্রকে দেবে। ৬. অঙ্গরাজ্যগুলােকে আলিক নিরাপত্তার জন্য আধাসামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দেওয়া। 

গ) উদ্দীপকে বর্ণিত হাে-চি-মিনের সাথে পাঠ্যপুস্তকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ডে মিল রয়েছে। উদ্দীপকে দেখা যায়, হাে-চি-মিন ভিয়েতনামের রাজনীতিতে এক অতুলনীয় ব্যক্তি যিনি গণমানুষের জন্য মানবতার পক্ষে লড়াই করেছিলেন। বিভিন্ন কার্যাবলির মাধ্যমে তিনি ভিয়েতনামের জাতির জনক উপাধিতে অভিষিক্ত হয়েছেন। তদ্রুপ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতৃত্ব প্রদানকারী ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর সারাজীবন নির্দেশিত হয়েছে। বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে। তারই কিছু উদাহরণ ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দিদের একজন হওয়া, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরােধী আন্দোলনে নেতৃত্ব, '৬৬ এর ছয় দফা, '৬৯- এর গণঅভ্যুত্থান, '৭০-এর নির্বাচন এবং '৭১ এ যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান। আর এভাবে পরাধীন বাংলাকে স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়ে দেওয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে এদেশের জাতির জনক বলা হয়। এভাবেই শেখ মুজিবুর রহমান ও হাে-চি-মিনের বৈশিষ্ট্যগত ও কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিকসমূহের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। 

🔆🔆 আরও দেখুন: জন্ম নিবন্ধন তথ্য অনুসন্ধান করা (মাত্র ১ মিনিটে)

ঘ) ইঙ্গিতপূর্ণ চরিত্র অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চরিত্রের দৃঢ়তা ও আপসহীন নেতৃত্বেই আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে । বাংলাদেশের জন্মের বহু আগেই তিনি একটি স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানি শােষকের নিপীড়নমুক্ত, সুন্দর ও স্বপ্নময়। আর সেই স্বপ্ন পূরণে বঙ্গবন্ধু বরাবর ছিলেন অটুট ও অনমনীয়। ভাষা আন্দোলনকে বলা হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ধারা। এরপর বাংলার ইতিহাসে আসে যুক্তফ্রন্ট, '৫৬-এর সংবিধান, আইয়ুব খানের সামরিক সরকার বিরােধী আন্দোলন, বৈষম্য, ছয় দফা দাবি, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ৭০-এর নির্বাচন আর ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এসবের প্রতিটি ঘটনা ছিল অগ্রপথিকের ন্যায়। নির্ভীকচিত্তে তিনি বাঙালিদের জন্য লড়াই করেছেন। জেলবন্দি হয়েছেন অসংখ্যবার; এমনকি পাকিস্তানি চব্বিশ বছরের শাসনামলের মধ্য ১২ বছর তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। আগরতলা মামলার এক নম্বর আসামি হওয়া কিংবা পাকিস্তানের এক নম্বর শত্রু বলে চিহ্নিত হওয়ার কোনােটিই তাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তার এই দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস, দূরদর্শিতাই, বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি দমে গেলে এই বাংলায় আর কেউ এতটা নির্ভয়ে দেশকে নিয়ে এগিয়ে যেতে সাহস করত না। অথচ তিনি সত্যের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। আর তার চরিত্রের এ অনমনীয়তা ও আপসহীন ব্যক্তিত্বই ৭ মার্চের ভাষণে প্রতিফলিত হয়েছে, আর জন্ম হয়েছে স্বাধীন বাংলার।

সৃজনশীলঃ ০২

জনাব মার্টিন নামে একজন বিদেশি নাগরিক ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে আসেন। এখানে এসে তিনি একটি প্রামাণ্য চিত্র দেখেন। উক্ত প্রামাণ্য চিত্রে তিনি দেখলেন যে, একজন রাজনৈতিক নেতা ঐতিহাসিক ভাষণ দিচ্ছেন। তার ভাষণ মানুষকে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। এ নেতা তার সারাজীবনের কর্মকাণ্ড, সংগ্রাম ও আন্দোলন তার জাতির মুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত করেন। 

ক. কে প্রথম জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন?
খ. দ্বিতীয় বিপ্লব বলতে কী বােঝ?
গ. উদ্দীপকে ইঙ্গিত করা ভাষণের মূল বিষয়গুলাে ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকের শেষ বক্তব্যটির সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন কর। 

ক)বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম জাতিসংঘে (সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে) বাংলায় ভাষণ দেন। 

খ) মুক্তিযুদ্ধের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ যখন ব্যস্ত, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, খাদ্য সংকট ও বন্যায় খাদ্যোৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। দেশের অভ্যন্তরে মজুদদার, দুর্নীতিবাজ যড়যন্ত্রকারী গােষ্ঠী তৎপর হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু সরকার জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং শােষণহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন দল নিয়ে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করেন। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবর্তিত এ ব্যবস্থাকে জাতির জনক “দ্বিতীয় বিপ্লব' বলে অভিহিত করেন। 

গ) উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত ভাষণটি হলাে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সােহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠীর শোষণ-শাসন, বনার ইতিহাস, নির্বাচনে জয়ের পর বাঙালির সাথে প্রতারণা ও বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরেন। উদ্দীপকে জনাব মার্টিন প্রামাণ্য চিত্রে বঙ্গবন্ধুকে ভাষণ দিতে দেখেন। এ ভাষণ থেকে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা পায় । এ ভাষণের পরেই বাঙালি জাতির সামনে একটি মাত্র গন্তব্য নির্ধারণ হয়ে যায়, তাহলে স্বাধীনতা'। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ডাক দেন, সে ডাকেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে পরবর্তী করণীয় ও স্বাধীনতা লাভের দিকনির্দেশনা ছিল- “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তােলাে। তােমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মাকাবিলা করতে হবে..." শুধু বাঙালি জাতি নয়, বিশ্বের ইতিহাসে এ ভাষণ এক স্মরণীয় দলিল। পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব ঐতিহাসিক ভাষণের নজির আছে ৭ মার্চের ভাষণ তার মধ্যে অন্যতম; পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী মানুষের নিকট এ ভাষণ অমর হয়ে থাকবে। 

ঘ) “এ নেতা তার সারা জীবনের কর্মকাণ্ড, সংগ্রাম ও আন্দোলন তার জাতির মুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত করেন।” - উদ্দীপকের শেষ এ বাক্যটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে দিবালােকের মতােই সত্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব দেন স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। ১৯৪৮-১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। কী সংসদ, কী রাজপথ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে তার কণ্ঠ ছিল সর্বদা সােচ্চার। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদান, ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরােধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা কর্মসূচি পেশ ও ৬ দফাভিত্তিক আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন বিজয়, ১৯৭১ সালের অসহযােগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ঘােষণা ও স্বাধীনতা অর্জনে একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করেন স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উদ্দীপকে জনাব মার্টিন বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য জীবনের ওপর তৈরি প্রামাণ্যচিত্র দেখেছিলেন। সেখানে তিনি দেখতে পান পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের শাসনের মধ্যে ১২ বছর বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। সংগ্রামের পথ ধরে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। ২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার। বাহিনী সশস্ত্র আক্রমণে ঝাপিয়ে পড়লে ২৬ মার্চ ১৯৭১ প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। তার নামেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। পরিশেষে তাই একবাক্যে বলা যায়, উদ্দীপকের শেষ বক্তব্যটি যথার্থ।

সৃজনশীলঃ ০৩

স্বাধীনতাযুদ্ধে আপামর জনসাধারণের পাশাপাশি আমাদের দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শাহনাজ পারভীন মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করতেন। তার ছােট ভাই কামাল আহমেদ বিবিসির সাংবাদিক ছিলেন। বড় ভাই মুজিবনগর সরকারের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। 

ক. মুজিবনগর সরকারের কয়টি মন্ত্রণালয় ছিল?
খ. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কী ছিল?
গ. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আলােচনা কর।
ঘ. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঠিক নেতৃত্বই আমাদের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছে’--উক্তিটির মূল্যায়ন কর। 

ক) মুজিবনগর সরকারের ১২টি মন্ত্রণালয় ছিল। 

খ) মুক্তিযুদ্ধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পী-সাহিত্যিক- বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মীর অবদান ছিল খুবই প্রশংসনীয়। পত্রপত্রিকার লেখা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পাঠ, দেশাত্মবােধক গান, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, কবিতা পাঠ, নাটক, কথিকা, এম, আর আকতার মুকুলের অত্যন্ত জনপ্রিয় চরমপত্র’ অনুষ্ঠান এবং জল্লাদের দরবার' ইত্যাদি রণক্ষেত্রে মুক্তিযােদ্ধাদের মানসিক ও নৈতিক বল ধরে রাখতে সহায়তা করেছে, সাহস, জুগিয়েছে, জনগণকে শত্রুর বিরুদ্ধে দুর্দমনীয় করেছে। 

গ) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় তাতে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযােদ্ধা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অচালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অপরদিকে, সহযােদ্ধা হিসেবে আহত মুক্তিযােদ্ধাদের আশ্রয়দান ও তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এদেশে অগণিত নারী মুক্তিযােদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়াও স্বামী, সন্তান, ভাইকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রেরণা দিয়েছেন, এমন নজিরও আমরা নবীদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। নারীদের এরূপ প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ সহযােগিতা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের গতিকে ত্বরান্বিত এজন্য বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবােজ্জ্বল। 

ঘ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঠিক নেতৃত্বই আমাদের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সারাজীবনের কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে। এ লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দিদের মধ্যে অন্যতম। কি সংসদ, কি রাজপথ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে তাঁর কণ্ঠ ছিল সর্বদা সােচ্চার। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান, ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরােধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা কর্মসূচি পেশ ও ৬ দফাভিত্তিক আন্দোলন, '৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন বিজয়, ১৯৭১ সালের অসহযােগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ঘােষণা ও স্বাধীনতা অর্জনে একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করেন স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই আমরা বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঠিক নেতৃত্বই আমাদের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছে।

সৃজনশীলঃ ০৪

মাসুদ, আরিয়ান ও জামশেদের মতাে অনেকেই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। তারা তাদের শক্তি সামর্থ্য দিয়ে শত্রুর মােকাবিলা করে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছিল। তাদের অনেক বন্ধু প্রাণ হারালেও, তারা ভয় পেয়ে ঘরে ফিরে আসেনি। যুদ্ধকে তার না। জয় অথবা মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

ক. ১৯৭১ সালের কোন তারিখে তাজউদ্দীন আহমেদ মুজিবনগর সরকার গঠনের কথা প্রচার করেন?
খ. তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যর্থ হওয়ার কারণ কী? ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকে স্বাধীনতা যুদ্ধের যে শ্রেণির ব্যক্তিদের সাহসের প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হয়েছে তার ব্যাখ্যা দাও।
ঘ. তুমি কি মনে কর, শুধুমাত্র এ শ্রেণির ব্যক্তিদের সাহসের প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হয়েছে তার ব্যাখ্যা দাও।
 

ক) ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ মুজিবনগর সরকার গঠনের কথা প্রচার করেন। 

খ)১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।এতে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামীসহ মােট ২৮টি দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দল জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযােগ উত্থাপন করে । পর্যবেক্ষকগণও এ অভিযােগের যথার্থতাকে সমর্থন করেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পর থেকেই সকল সরকার বিরােধী দল, সাধারণ জনগণ, নাগরিক ও সমাজ বিক্ষোভ করে যা তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যর্থতার কারণ। 

গ) উদ্দীপকে উল্লিখিত স্বাধীনতা যুদ্ধের যে শ্রেণির ব্যক্তিদের সাহসের প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হয়েছে তারা হলেন ছাত্রসমাজ। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্ররা নিজের দেশকে, দেশের মানুষকে শত্রুমুক্ত করার জন্য অস্ত্র হাতে রাজপথে নেমে এসেছিল। শত্রুর মােকাবিলা করেছিল। পাকিস্তানের চব্বিশ বছরে বাঙালি জাতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল আন্দোলনে গৌরবােজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে এদেশের ছাত্রসমাজ। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালের শিক্ষা কমিশন রিপাের্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফার আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে ১১ দফার আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযােগ আন্দোলন, প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিরাট অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যােগ দেয়। অনেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরােধ করে। মুক্তিবাহিনীতে একক গােষ্ঠী হিসেবে ছাত্রদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখার এক বিরাট অংশ ছিল ছাত্র । মুক্তিযুদ্ধের এক পর্যায়ে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল মূলত ছাত্রদের নিয়ে। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সর্বোপরি বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র সমাজের মহান আত্মত্যাগ ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হতাে। 

ঘ) শুধুমাত্র এ শ্রেণির অর্থাৎ ছাত্রসমাজের সাহসের প্রতিচ্ছবি এখানে প্রকাশিত হয়নি। ছাত্রদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন- শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, সাহিত্যিক, প্রযুক্তিবিদ, আমলা, বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা অনন্য ও গৌরবদীপ্ত । পেশাজীবীদের বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবােজ্জ্বল । ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, তাতে নারীদের, বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযােদ্ধা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অস্ত্রচালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। এছাড়াও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্মবােধক গান, মুক্তিযােদ্ধাদের বীরত্ব গাথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা ইত্যাদি দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। সাধারণ মানুষ মুক্তিযােদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, শত্রুর অবস্থান ও চলাচলের তথ্য দিয়েছে, খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করেছে। সেবা দিয়েছে ও খবরাখবর সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগােষ্ঠীর জনগণও এতে অংশগ্রহণ করে। প্রবাসী বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সাহায্য-সহযােগিতা করেন। বিভিন্ন দেশে তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে পার্লামেন্ট সদস্যদের নিকুট ছুটেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন। পাকিস্তানকে অস্ত্র গােলাবারুদ সরবরাহ না করতে সরকারের নিকট আবেদন করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদানও অপরিসীম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবর্গ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ত্যাগ স্বীকার করেছেন। নানা অত্যাচার নিপীড়ন সহ্য করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকে শেষপর্যন্ত জীবন বাজি রেখে তারা রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেছেন। পরিশেষে বলা যায়, ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী, নারী, গণমাধ্যম, জনসাধারণ, রাজনৈতিকবৃন্দ সকলের সমন্বয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথকে সুগম করেছিল বলে আমি মনে করি।